ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
* বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর পোশাক রফতানি বেড়েছে * বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমালো এডিবি

রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাড়ছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

  • আপলোড সময় : ১৫-০১-২০২৫ ১১:২৬:১৭ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৫-০১-২০২৫ ১১:২৬:১৭ পূর্বাহ্ন
রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাড়ছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা
গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের বেশিরভাগ অর্থনৈতিক সূচক চাপের মধ্যে আছে। জিনিসপত্রের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় দুই বছরের ব্যবধানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং প্রতি মাসে রিজার্ভ কমছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। ফলে, আমদানি নির্ভর এই অর্থনীতির আমদানি ব্যয় অনেক বেড়েছে। অপরদিকে আগস্টের শুরুতে শ্রমিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত, ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়ার রফতানি বেড়েছে। এদিকে গত জুলাই ও আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ায় চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পাঁচ দশমিক এক শতাংশে নামিয়ে এনেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। অপরদিকে ম্যানিলাভিত্তিক বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থাটি এর আগে পূর্বাভাসে বলেছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে পণ্য ও সেবার সার্বিক উৎপাদন ছয় দশমিক ছয় শতাংশ হবে। এছাড়াও, প্রবাসী ও রফতানি আয় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কমেছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ একেবারেই নিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতির এই অস্থিরতার পেছনে করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি দুর্বল ব্যবস্থাপনা কাঠামোও দায়ী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এসবের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা যত বাড়বে অর্থনীতি আরও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবসময় অর্থনৈতিক ইস্যুতে প্রাধান্য পায়, তাই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে না।’ গত সোমবার রাজধানীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর দেশে নতুন করে রাজনৈতিক শংকা দেখা দিয়েছে এবং ইতোমধ্যে হরতালের কবলে পড়েছে দেশ। এদিকে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের রিজার্ভ ক্রমাগত কমছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা এক দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম এবং ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি প্রধান উৎস রফতানি আয় এসেছে চার দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১০ দশমিক চার শতাংশ বেশি, কিন্তু গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় চার মাসের আমদানি বিল মেটানোর জন্য যথেষ্ট। যদিও ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ফিচের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে রিজার্ভ তিন মাসের আমদানি বিল পরিশোধের পরিমাণে নেমে আসবে। আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশের রাজনীতিবিদরা আপোস করতে চান না। তাদের এমন মনোভাব আদতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিয়েছে। তাই বলা যায়, দুর্ভাগ্যজনক হলেও দেশ আরও রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে, বলেন তিনি। উদাহরণ টেনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন না এবং ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আগ্রহী হবে না। এগুলো অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যোগ করেন তিনি।’ ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক আগামী বছরের ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া চলতি অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ছয় শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ছয় দশমিক এক শতাংশে নামিয়ে এনেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। ফলে, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’ বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা ও নিরাপত্তাসহ একটি অনুকূল পরিবেশ চায়। আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকলে এটি সম্ভব হয়, যোগ করেন তিনি।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম গত শনিবার সকালে ডেইলি স্টারকে বলেন, রাজনৈতিক সংকট এখনো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেনি। তিনি বলেন, ‘কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে হরতাল ও অস্থিতিশীলতা চলতে থাকলে অর্থনৈতিক সমস্যা আরও প্রকট হবে। হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন অবস্থায় আছে। এর মাঝে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। তাই আমরা উদ্বিগ্ন। এখন একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রয়োজন।’ ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, ‘শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডিএসইর লেনদেন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে ৭৯৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আস্থা ফিরে আসবে। ক্ষমতাসীন সরকারের উচিত বেশি ছাড় দিয়ে সমঝোতা করা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনা।’ আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, সংলাপ হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করা সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। সব রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যেন তাদের কর্মকাণ্ড অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে না পারে। জানা গেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সেপ্টেম্বরে ভারতের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানি বার্ষিক ১৭ দশমিক তিন শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ভারতের পোশাক রফতানির এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা এ খাতের অন্যান্য দেশের ওপর প্রভাব ফেলেছে। অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান সুধীর শেখরি বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রতিকূলতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও ভারতের তৈরি পোশাক রফতানির রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষস্থানীয় পোশাক রফতানিকারক দেশ মন্দার সম্মুখীন হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে ভারত লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। ফলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ভারতের কেয়াররেটিংয়ের কথা উল্লেখ করে দ্য টেলিগ্রাফ আরও বলেছে, যদি এক বা দুই প্রান্তিকের বেশি এ অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে বাংলাদেশি রফতানিকারকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি দিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি পাঁচ দশমিক তিন শতাংশ বেড়ে ৯ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যে প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলেও ২০২৪ সালের প্রথম আট মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রফতানি উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না। অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ কমে চার দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রফতানি কমার জন্য ওটেক্সা মার্কিন বাজারে পোশাকের চাহিদা কমাকে দায়ী করেছে। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্য মিলিয়ে রফতানি ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ কমে চার দশমিক ৮৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে ভালো করেছে। কারণ তথ্যে দেখা গেছে, তাদের রফতানির পরিমাণের দিক দিয়ে বেড়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলো এসব বাজারে পোশাক পণ্যসহ খুচরা পণ্যগুলোতে ভোক্তাদের ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে, বিশেষ করে মার্কিন বাজারে। বিশ্বের বৃহত্তম খুচরা বাণিজ্য সংগঠন ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশনের (এনআরএফ) প্রধান অর্থনীতিবিদ জ্যাক ক্লেইনহেঞ্জ বলেন, ‘কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার কমায় সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা বিক্রি আবার বেড়েছে।’ জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিমাণ বার্ষিক এক দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়েছে, অন্যদিকে পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে তিন দশমিক আট শতাংশ। এ সময়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি তিন দশমিক ছয় শতাংশ বেড়েছে। বিজিএমইএ সংকলিত ওটেক্সার-এর তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের পোশাক রফতানি বেড়েছে পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ, ভারতের সাত দশমিক ছয় শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার বেড়েছে সাত দশমিক সাত শতাংশ। একইভাবে বিজিএমইএ সংকলিত ইউরোস্ট্যাট তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোর পোশাক আমদানি বেড়েছে তিন দশমিক তিন শতাংশ এবং বাংলাদেশ থেকে বেড়েছে মাত্র দুই দশমিক আট শতাংশ। এ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের পোশাক রফতানি ছয় দশমিক চার শতাংশ, ভারতের পাঁচ দশমিক ১৮ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ভিয়েতনামের ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১৪ দশমিক ৪১ শতাংশ পোশাক রফতানি বেড়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সবমিলিয়ে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে পাঁচ দশমিক ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যেখানে ভিয়েতনামের ১৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ ও ভারতের ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশের চেয়ে অন্যান্য দেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে। বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা নির্বিঘ্নে উৎপাদন ও সময়মতো শিপমেন্ট করতে পারছে না। তারা বলেছেন, তৈরি পোশাকের কিছু বিদেশি ক্রেতা কারখানা পরিদর্শন স্থগিত করেছে। আবার কিছু ক্রেতা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরুর পর থেকে বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা চালু ও বন্ধের মধ্যে পড়তে হয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলামও এ কে আজাদের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসায় ক্রেতারা এখন ফিরতে শুরু করেছেন।’ এদিকে এডিবি বলছে, সাম্প্রতিক বন্যা বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। রাজস্ব ও আর্থিক নীতিগুলো কঠোর থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। ক্রয় ও বিনিয়োগ আরও কমাবে। নেতিবাচক ঝুঁকি থাকায় সামষ্টিক অর্থনীতির পূর্বাভাস অত্যন্ত অনিশ্চিত। প্রাথমিকভাবে এই ঝুঁকিগুলো চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আর্থিক খাতে দুর্বলতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের দেয়া গত জুনের পূর্বাভাসের তুলনায় কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পাঁচ দশমিক সাত শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। এডিবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কঠোর বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে চাহিদা কমানো হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, পণ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া ও টাকার দাম কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেশি আছে। আমদানি-রফতানি কমে যাওয়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে বলেও জানিয়েছে এডিবি। সংস্থাটি আরও পূর্বাভাস দিয়েছে যে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারে। এডিবির দৃষ্টিতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সুদ ও টাকার বিনিময় হার যথাযথ নীতির মাধ্যমে স্থিতিশীল করা ও অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে দ্রুত সংস্কারের ওপর। ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক হিসাবের ওপর অব্যাহত চাপ, আমদানি কমানো ও বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতির মধ্যে বাংলাদেশ গত দুই অর্থবছরে ছয় শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল পাঁচ দশমিক ৭৮ শতাংশ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাঁচ দশমিক ৮২ শতাংশ। বিগত সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছয় দশমিক ৭৫ শতাংশ ধরেছিল। অর্থনীতিবিদরা চলমান চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে একে ‘উচ্চাভিলাষী’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছিলেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স